
ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নেমেছে বিরোধী রাজনৈতিক দল, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন। এই পরিস্থিতিতে আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে বড় ধরনের বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janta Party—CJP)। দলটির প্রধান দাবি, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে এবং বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। তবে দিল্লি পুলিশ প্রস্তাবিত কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি।
‘ভোট চোর’ স্লোগানে উত্তাল রাজনৈতিক অঙ্গন
আন্দোলনকারীদের মধ্যে ‘ভোট চোর, গদি ছাড়ো’ এবং ‘নরেন্দ্র মোদি ভোট চোর’—এ ধরনের স্লোগান শোনা যাচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। তাঁদের দাবি, এর ফলে প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং ক্ষমতাসীন বিজেপি রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পেতে পারে।
তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে মৃত, দ্বৈত বা অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করাই এই সংশোধন কার্যক্রমের উদ্দেশ্য। যাঁদের নাম ভুলবশত বাদ পড়েছে, তাঁদের পুনরায় তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও কমিশন জানিয়েছে। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগ ও নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যার মধ্যে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি
ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দলটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের পাশাপাশি ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম বন্ধ, পুরোনো ভোটার তালিকা পুনর্বহাল এবং পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
গত ৮ অক্টোবর কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আয়োজিত বিক্ষোভেও CJP-র নেতাকর্মীরা অংশ নেন। ওই কর্মসূচিতে অভিনেতা প্রকাশ রাজ ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও উপস্থিত ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরোধিতা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেওয়া হয়।
দিল্লিতে বাড়তি নিরাপত্তা, অনুমতি দেয়নি পুলিশ
১০ অক্টোবরের প্রস্তাবিত বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, CJP-র কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়নি। অনুমতি ছাড়া জমায়েত করে বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দিল্লিতে যাওয়ার পথে বিভিন্ন রাজ্যে তাঁদের সমর্থকদের আটক করা হচ্ছে। তবে আটকসংক্রান্ত দলটির সব দাবি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তাই এসব অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই।
‘১৯৪৭ সালের পর কঠিন সময়’—দাবির বাস্তবতা কী?
ভারতের জন্য আগামী ৭২ ঘণ্টাকে ১৯৪৭ সালের পর অন্যতম কঠিন সময় হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে—এমন বক্তব্য প্রচারিত হলেও, নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রে এই নির্দিষ্ট মূল্যায়নের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো বিশেষজ্ঞের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে প্রতিষ্ঠিত বিশ্লেষকদের অভিন্ন মতামত হিসেবে প্রকাশ করা সমীচীন হবে না।
তবে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক, বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক বিক্ষোভ, আন্দোলনকারীদের আটকের অভিযোগ এবং রাজধানীতে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা—সব মিলিয়ে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উত্তেজনা রয়েছে। আগামী ১০ অক্টোবরের কর্মসূচি ঘিরে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আগামী কয়েক দিন আন্দোলনকারীরা ঘোষিত কর্মসূচিতে কতটা অংশ নিতে পারেন, পুলিশি বিধিনিষেধ কীভাবে কার্যকর হয় এবং নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে নতুন কোনো বক্তব্য আসে কি না—এসব বিষয় পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই বিক্ষোভের ফলে সরকার পতন, নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ কিংবা বড় ধরনের সাংবিধানিক সংকট নিশ্চিত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই।
সব মিলিয়ে, ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধ এখন আর কেবল প্রশাসনিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; এটি নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা, ভোটাধিকার এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনের ঘটনাপ্রবাহই দেখাবে, এই আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয় এবং এর রাজনৈতিক প্রভাব কতদূর পৌঁছায়।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক রির্পোট ।। World Hindu Times 
























