
রামুতে বৌদ্ধবিহার ও বসতিতে হামলার ১৪ বছর পূর্ণ হলেও ১৮টি মামলার একটিতেও এখন পর্যন্ত রায় হয়নি। অভিযোগপত্রে ৯৯৩ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, সাক্ষ্য দিতে অনীহা, পুনঃতদন্ত এবং মামলাগুলো বিভিন্ন আদালতে ছড়িয়ে থাকার কারণে বিচার কার্যত স্থবির হয়ে আছে
কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধবিহার, ধর্মীয় স্থাপনা ও বৌদ্ধ বসতিতে হামলা-লুটপাট-অগ্নিসংযোগের ভয়াবহ ঘটনার ১৪ বছর পূর্ণ হলো আজ, ২৯ সেপ্টেম্বর। ২০১২ সালের এই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ধর্ম অবমাননার একটি গুজবকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতায় রামুর বহু বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভেঙে পড়েছিল। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রাচীন বৌদ্ধবিহার, ভাঙচুর করা হয়েছিল ধর্মীয় নিদর্শন, আক্রান্ত হয়েছিল সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি।
সময়ের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বিহার ও বসতিগুলোর অনেকটাই পুনর্নির্মিত হয়েছে। রামুর জনজীবনও বহুলাংশে স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া আজও সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে—১৪ বছরেও ১৮টি মামলার একটিও নিষ্পত্তি হয়নি, কোনো আসামির দণ্ড হয়নি।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রামুতে হামলাকারীরা ১২টি বৌদ্ধবিহার ও অন্তত ২৬টি বৌদ্ধ বসতিতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায় বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরদিন উখিয়া ও টেকনাফে আরও সাতটি বৌদ্ধবিহারে হামলা হয়। বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন হিসাব পাওয়া গেলেও, হামলার ব্যাপ্তি ও এর সংগঠিত চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে শুরু থেকেই।
হামলার ঘটনায় রামু, উখিয়া ও টেকনাফে মোট ১৯টি মামলা হয়েছিল। পরে একটি মামলা প্রত্যাহার হওয়ায় বর্তমানে ১৮টি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলায় ৯৯৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে বলে জেলা পুলিশ ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। মামলাগুলোর সঙ্গে প্রায় এক হাজার আসামি ও প্রায় ১৬০ জন সাক্ষী যুক্ত আছেন।
কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক আসামি ও সাক্ষী থাকা সত্ত্বেও বিচার কেন এগোয়নি—এই প্রশ্নের উত্তর মিলছে মূলত সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে। কক্সবাজারের সরকারি কৌঁসুলি মোহাম্মদ ইউনুস জানিয়েছেন, সাক্ষীদের অনুপস্থিতি ও সাক্ষ্য দিতে অনীহার কারণে বিচার দীর্ঘায়িত হচ্ছে। তিনটি মামলা বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুনঃতদন্তাধীন বলেও তিনি জানান।
২০২৫ সালের অনুসন্ধানে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ১৮টি মামলার কোনোটিই তখন শেষ হয়নি এবং সব আসামিই জামিনে ছিলেন। কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন পিপি মো. সিরাজুল ইসলামও মামলাগুলো বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন থাকার কথা বলেছিলেন, যদিও তিনি প্রতিটি মামলার হালনাগাদ অবস্থা জানাতে পারেননি।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতাদের বক্তব্য, সাক্ষ্য না আসার পেছনে শুধু অনীহা নয়, নিরাপত্তাহীনতা এবং তদন্ত নিয়ে আস্থার সংকটও কাজ করছে। স্থানীয় বৌদ্ধ নেতাদের অভিযোগ, হামলার সময় ধারণ করা ছবি ও ভিডিওতে যাদের দেখা গিয়েছিল, তাদের অনেকের নাম অভিযোগপত্রে নেই। আবার হামলায় জড়িত নন—এমন ব্যক্তিরাও আসামি হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের প্রশ্ন সাক্ষীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের আবাসিক প্রধান প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেছেন, ১৪ বছরেও একটি মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া হতাশাজনক এবং দায়ীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা জরুরি। রামু উপজেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি রিটন বড়ুয়ার ভাষ্য, অভিযোগপত্রে প্রকৃত হামলাকারীদের বাদ পড়ার অভিযোগ এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে সাক্ষীরা নিজেদের নিরাপদ বোধ করেন না।
এই সংকট নতুন নয়। ২০২২ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তৎকালীন পিপি ফরিদুল আলম বলেছিলেন, ১৮ মামলার ১৬৭ সাক্ষীর অধিকাংশই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ; বারবার নোটিশ ও তাগাদা সত্ত্বেও অনেকে আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাননি। একই প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়—যাদের হামলাকারী হিসেবে তাঁরা চেনেন, তাঁদের সবাইকে আসামি করা হয়েছে কি না।
হামলার পর একাধিক তদন্ত হয়। ২০১৩ সালের মে মাসে জমা দেওয়া বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে স্থানীয় প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার কথা উঠে আসে। ওই তদন্তে ২৯৮ জনকে হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো ও জনসচেতনতা তৈরিসহ ২০টি সুপারিশ দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সহিংসতার পরিকল্পনা অন্তত ১০ দিন আগে থেকে করা হয়েছিল এবং ২০৫ জন এতে জড়িত ছিলেন। অন্যদিকে পুলিশ-নেতৃত্বাধীন তদন্তে তৎকালীন রামু থানার ওসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও জেলা পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক ছিল। এতগুলো তদন্ত ও ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যার পরও কারা পরিকল্পনাকারী, কারা মাঠপর্যায়ের হামলাকারী এবং কারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ ছিলেন—সে প্রশ্নের চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি হয়নি।
২০১২ সালের অক্টোবরে হামলাকারী ও দায়িত্বে অবহেলাকারীদের জবাবদিহির দাবিতে হাইকোর্টে দুটি রিট আবেদন করা হয়েছিল। আদালতের নির্দেশে একাধিক অনুসন্ধান হলেও সেই রিটের চূড়ান্ত শুনানি ও রায় এখনো হয়নি বলে ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
রামুর সহিংসতার সূত্রপাত হয়েছিল ফেসবুকে কোরআন অবমাননার অভিযোগসংবলিত একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর। পরে দ্য ডেইলি স্টার-এর অনুসন্ধানে সেই ছবিযুক্ত ফেসবুক পেজটি ফটোশপে তৈরি করা হয়েছিল বলে উঠে আসে। ওই গুজবকে কেন্দ্র করেই সংঘবদ্ধ হামলা শুরু হয়।
যাঁর নামকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ানো হয়েছিল, সেই উত্তম কুমার বড়ুয়াও ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ। ২০২২ সালেও তাঁর পরিবারের সদস্যরা তাঁর অবস্থান জানেন না বলে জানিয়েছিলেন। উত্তমের নিখোঁজ থাকা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; রামু সহিংসতার সূত্র, গুজবের উৎস এবং ঘটনার প্রকৃত পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করার প্রশ্নের সঙ্গেও এটি জড়িয়ে আছে।
হামলার পর সরকার ক্ষতিগ্রস্ত বিহার ও বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ করে দেয়। এটি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তাৎক্ষণিক পুনর্বাসনে ভূমিকা রাখলেও, সম্প্রদায়ের নেতাদের বক্তব্য—স্থাপনা ফিরে পাওয়া আর বিচার পাওয়া এক বিষয় নয়। একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত সহিংসতার দায় নির্ধারণ না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকাতে কার্যকর বার্তা যায় না।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী জেড আই খান পান্না ২০২৫ সালে বলেন, রামুর ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে পরবর্তী সময়ে নাসিরনগরসহ অন্য জায়গায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা প্রতিরোধে তা ভূমিকা রাখতে পারত। তাঁর বক্তব্য, বিচার বিলম্বিত হওয়া কেবল পুরোনো একটি মামলার সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

ডেস্ক রির্পোট । World Hindu Times 























