
বাংলার প্রচলিত একচালা দুর্গামূর্তিতে মা দুর্গার দুই পাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী—এটি নিছক "মায়ের দুই মেয়ে" বা লোককথার বিষয় নয়; এর অন্তর্নিহিত তত্ত্বে রয়েছে আদ্যাশক্তির তিন কার্যরূপের একীভূত দর্শন।
শাক্ত দর্শনের কেন্দ্রীয় মন্ত্র হলো—দেবী এক, প্রকাশ বহু। শ্রী শ্রী চণ্ডী বা দেবীমাহাত্ম্যের পঞ্চম অধ্যায়ের বিখ্যাত দেবীসূক্তে বলা হয়েছে, "যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা"—অর্থাৎ যে দেবী সমস্ত জীবের মধ্যে শক্তিরূপে বিরাজমান, সেই দেবীকে বারংবার নমস্কার। এখানে দেবীকে কেবল একটি নির্দিষ্ট মূর্তি হিসেবে নয়, বরং সকল শক্তির মূলস্বরূপ হিসেবে দেখা হয়েছে।
তাই শাক্ত ব্যাখ্যায় দুর্গা হলেন আদ্যাশক্তি বা মহাশক্তির প্রতীক, যা রক্ষা ও ধর্মসংস্থাপনের শক্তি। লক্ষ্মী হলেন ঐশ্বর্য, শ্রী, পুষ্টি ও সমৃদ্ধির শক্তির প্রতীক। সরস্বতী হলেন জ্ঞান, বুদ্ধি, বিদ্যা ও বাক্শক্তির প্রতীক। এরা তিনটি আলাদা স্বাধীন সর্বোচ্চ শক্তি নন; বরং এক পরাশক্তির তিনটি সগুণ স্বরূপ-কার্যপ্রকাশ।
লক্ষ্মী শুধু টাকা-পয়সার দেবী নন। "শ্রী" মানে সৌন্দর্য, মঙ্গল, সমৃদ্ধি, পুষ্টি, সৌভাগ্য, ঐশ্বর্য—জীবনকে ধারণ ও বিকশিত করার শক্তি। অন্যদিকে দুর্গা হলেন রক্ষা ও ধর্মসংস্থাপনের মহাশক্তি। প্রতিমায় দুর্গার পাশে লক্ষ্মীর অবস্থানের তাত্ত্বিক অর্থ দাঁড়ায়—শক্তি যদি থাকে কিন্তু শ্রী না থাকে, তবে সৃষ্টি ও সমাজ টিকে থাকে না। দুর্গা অশুভকে বিনাশ করেন, কিন্তু বিনাশের পর ধর্মময় জীবনকে সমৃদ্ধ ও পুষ্ট করার শক্তি হল বামাবর্তী শ্রীলক্ষ্মী। তাই দুর্গা রক্ষা ও শক্তিকে প্রকাশ করছেন, আর লক্ষ্মী শ্রী, পুষ্টি ও সমৃদ্ধিকে প্রকাশ করছেন।
সরস্বতী এখানে শুধু বিদ্যালয়ের বিদ্যার দেবী নন; তিনি বিদ্যা, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, বাক্ ও চেতনার প্রকাশ। দেবীমাহাত্ম্যের একই অধ্যায়ে দেবীকে বিভিন্ন মানসিক ও জাগতিক শক্তিরূপে অভিবাদন করা হয়েছে—চেতনা, বুদ্ধি, শক্তি, নিদ্রা, ক্ষুধা, দয়া, মাতৃভাব ইত্যাদি হিসেবে। দুর্গার পাশে সরস্বতীর উপস্থিতির গভীর অর্থ হচ্ছে—শক্তি যেন অন্ধ শক্তি না হয়; শক্তি যেন জ্ঞান দ্বারা পরিচালিত হয়। অর্থাৎ দুর্গা হলেন শক্তি, আর সরস্বতী হলেন সেই শক্তির জ্ঞান ও বিবেক। এই কারণে দুই দেবীর যুগল উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এখানেই আসল তন্ত্রোক্ত রহস্যটি ধরা যায়। একটি প্রতীকী শাক্ত ব্যাখ্যায় দুর্গা হলেন মহাশক্তির প্রকাশ, যা ক্রিয়া, রক্ষা ও পরাক্রমের প্রতিনিধি। লক্ষ্মী হলেন শ্রী, পুষ্টি ও ঐশ্বর্যের প্রকাশ, যা সম্পদ ও কল্যাণের প্রতিনিধি। সরস্বতী হলেন বিদ্যা, বুদ্ধি ও বাকের প্রকাশ, যা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতিনিধি। শক্তি, শ্রী ও বিদ্যা—এই তিনটি তত্ত্ব একত্র না হলে পূর্ণাঙ্গ মহাবিদ্যা হয় না। শুধু শক্তি থাকলে তা উগ্রতা হতে পারে, শুধু সম্পদ থাকলে তা ভোগ ও অহংকার হতে পারে, আর শুধু বিদ্যা থাকলে তা কার্যক্ষমতা ছাড়া নিষ্ক্রিয় হতে পারে। কিন্তু দুর্গার শক্তি, লক্ষ্মীর শ্রী ও সরস্বতীর বিদ্যার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ দেবীশক্তি, যা সাধকের মোক্ষসর্বস্বস্বরূপ।
তন্ত্রে দেবীকে কেবল একজন নির্দিষ্ট দেবী হিসেবে নয়, সমগ্র জগতের শক্তিতত্ত্ব হিসেবে দেখা হয়। মহানির্বাণতন্ত্রের ভূমিকায় দেবীর বিভিন্ন প্রকাশের মধ্যে সরস্বতী, লক্ষ্মী, দুর্গা প্রভৃতিকে একই মহাদেবীর বিভিন্ন রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এক শক্তি থেকে বহু শক্তিরূপের প্রকাশ ঘটে। যেমন অগ্নি এক, কিন্তু তার আলো, তাপ ও দাহ্যক্ষমতা আলাদা করে অনুভূত হয়। তেমনি আদ্যাশক্তি এক, কিন্তু তাঁর জ্ঞানশক্তি হল সরস্বতী, শ্রীশক্তি হল লক্ষ্মী, আর রক্ষাশক্তি বা দুর্গতিনাশিনী শক্তি হল দুর্গা।
দেবীভাগবত পুরাণে বলা হয়েছে, সৃষ্টিকালে সেই পরম প্রকৃতি পাঁচরূপে প্রকাশিত হন—দুর্গা, রাধা, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও সাবিত্রী। দুর্গা হলেন গণেশের জননী, শিবপ্রিয়া, নারায়ণী, বিষ্ণুমায়া এবং পূর্ণব্রহ্মের স্বরূপিণী। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্লোকে বলা হয়েছে, "তুমিই সরস্বতী, তুমিই সাবিত্রী, তুমিই শঙ্করী; তুমিই দুর্গা ভগবতী, তুমিই লক্ষ্মী। হে দেবী, তুমিই সর্বস্ব—তোমাকে প্রণাম।"
বাংলার প্রচলিত প্রতিমায় লক্ষ্মী-সরস্বতীর সঙ্গে গণেশ-কার্তিকও থাকেন, যারা বৈদান্তিক দৃষ্টিতে জয়দূর্গার সন্তান। প্রচলিত বিশ্বাস এই যে, সম্রাট আকবরের সময়ে ষোড়শ শতকের শেষের দিকে বর্তমান রূপের শারদীয় দুর্গাপূজা প্রচলিত হয়। দেবীমাহাত্ম্যের তিনটি চরিতা এবং নবরাত্রি পূজার মাধ্যমে এই তত্ত্ব বাঙালি সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে।
শারদীয় দুর্গাপূজার একচালা প্রতিমা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি দার্শনিক বার্তা বহন করে—জীবনে শক্তি, সমৃদ্ধি ও জ্ঞানের সমন্বয় অপরিহার্য। দুর্গার শক্তি ছাড়া লক্ষ্মীর শ্রী এবং সরস্বতীর বিদ্যা অসম্পূর্ণ; আবার এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ মহাবিদ্যা ও সাধকের মোক্ষপথ। এই শাক্ত দর্শন বাঙালি সংস্কৃতিতে কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং একটি জীবনদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—যেখানে শক্তি, সম্পদ ও জ্ঞানের ভারসাম্যপূর্ণ বিকাশই প্রকৃত কল্যাণের পথ।
নিবার্হী সম্পাদক: অর্জুন মালাকার
২০২৬ © সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত World Hindu Times