চট্টগ্রাম ০৪:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ
Logo বাংলাদেশে এটা আমার প্রথম দুর্গাপূজা: মার্কিন রাষ্ট্রদূত Logo সন্ধিপূজা ও কুমারী আরাধনায় উদ্‌যাপিত হচ্ছে মহাঅষ্টমী Logo নরসিংদীতে বাবার ত্যাগের গল্পে পূজা মণ্ডপসজ্জা Logo কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় টানা তিন বছর ধরে দুর্গাপূজা হচ্ছে না। Logo রংপুরের ঐতিহ্যবাহী করুণাময়ী কালীবাড়িতে জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গোৎসব Logo লালমনিরহাটে সনাতন সেবক সংঘের ২৯তম বৈদিক বিদ্যাপীঠের সমাপনী ও গীতাদান অনুষ্ঠান Logo ১২৮ বছরের ঐতিহ্যে মুলাটোল সার্বজনীন পূজা মন্দিরে দুর্গোৎসব Logo আগামী ২০শে অক্টোবর রংপুর মহানগরের পূজা মন্ডপ পরিদর্শনে আসবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান Logo দীঘিনালার রশিকনগর হরি মন্দিরে ভক্তিপূর্ণ পরিবেশে সপ্তমী পূজা উদযাপন Logo রাউজানে মনপোদ্দার বাড়িতে শতবর্ষ পূর্তিতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে দুর্গোৎসব
প্রায় এক দশক আগে মন্দির কমিটির কয়েকজন সদস্যের মাধ্যমে ইসকনের অনুসারীরা সেখানে কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৬ সালের দিকে তাঁরা মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নেন বলেও স্থানীয়দের দাবি।

ইসকন আসার পরই বদলে গেল মন্দিরের চিত্র? উচ্ছেদ-আতঙ্কে ৬ পরিবার!


যশোর শহরের চাঁচড়া রাজবাড়ীসংলগ্ন ঐতিহাসিক দশমহাবিদ্যা মন্দিরের জমি দখল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ—ইসকনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। মন্দির এলাকায় বসবাসকারী ছয়টি পরিবারকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

এদিকে মন্দির চত্বর থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রী শিপ্রা ঘোষের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় ইসকনের আট সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা মামলা হয়েছে। নিহতের ভাই পাপন কুমার ঘোষ রোববার যশোর আদালতে মামলাটি করেন। মামলায় শিপ্রাকে মারধরের পর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

 

১৮ সেপ্টেম্বর রাতে মন্দির চত্বরের একটি জরাজীর্ণ ঘর থেকে শিপ্রা ঘোষের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। সে শহরতলীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দশম শ্রেণিতে পড়ত।

পরদিন শিপ্রার লাশ নিয়ে স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা যশোর প্রেস ক্লাবের সামনে সড়কে বিক্ষোভ করেন। তাঁদের অভিযোগ, মন্দিরের অধ্যক্ষ ও তাঁর সহযোগীদের অসদাচরণ, গালাগাল, মারধর, অপমান ও যৌন হয়রানির শিকার হয়ে শিপ্রা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে।

তবে নিহতের পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তাঁদের অভিযোগ, শিপ্রাকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

মামলার বাদী পাপন কুমার ঘোষ অভিযোগ করেন, ঘটনার দিন ইসকনের অধ্যক্ষ অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাস এবং তাঁর সহযোগীরা প্রথমে তাঁর মাকে গালাগাল করেন ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে আহত করেন। পরে শিপ্রার ওপর হামলা চালানো হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে মন্দিরের অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাস আত্মগোপনে থেকে মুঠোফোনে বলেন, মন্দিরটি দেবোত্তর সম্পত্তি। কাউকে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়নি। শিপ্রাকে কোনো কটু কথা বলা হয়নি এবং তাঁকে মারধরের প্রশ্নই ওঠে না।

 

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মন্দির এলাকার জমিতে তাঁরা ৭০ থেকে ৮০ বছর ধরে বংশপরম্পরায় বসবাস করছেন। তাঁদের দাবি, প্রায় ৬২ শতক জমিতে আগে ১০টি পরিবার বসবাস করলেও বর্তমানে সেখানে ছয়টি পরিবার রয়েছে।

বাসিন্দা মৌসুমি ঘোষ, সুরঞ্জন বিশ্বাস, শুভ ঘোষ ও মনি বিশ্বাসের অভিযোগ, ইসকনের অনুসারীরা বিভিন্ন সময়ে তাঁদের জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্য হুমকি দিয়েছেন। মন্দিরের জায়গায় আরও বড় স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা থেকেই তাঁদের উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে বলে তাঁরা দাবি করেন।

তাঁদের ভাষ্য, ইসকনের অনুসারীরা মন্দিরের জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছেন। এ কারণে দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, মন্দিরের ভেতরে কয়েকটি ছোট ঘরে বাইরের তরুণদের রাখা হয়। তাঁরা বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে সেখানে অবস্থান করেন। তাঁদের পরিচয় ও অবস্থানের বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।

তবে মন্দিরে নতুন আসা সুমন বিশ্বাস ওরফে সুমুখ শ্যামহরিদাস বলেন, আগের পূজারিরা চলে যাওয়ায় পূজা চালু রাখার জন্য তাঁদের পাঠানো হয়েছে। মন্দিরের জমিতে বসবাসকারীদের উচ্ছেদের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শান্ত রায় নামে এক যুবকের বাড়ি পঞ্চগড়ের হাড়িভাসা গ্রামে। তিনি যশোর এমএম কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। প্রায় তিন মাস ধরে তিনি মন্দির এলাকায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

শান্ত রায় দাবি করেন, তিনি সেখানে ভাড়ায় থাকেন এবং প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা ভাড়া দেন। তবে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের কোনো প্রমাণপত্র দেখাতে তিনি রাজি হননি।

মন্দির এলাকায় কারা থাকেন, তাঁদের পরিচয় কী এবং কোন দায়িত্বে তাঁরা অবস্থান করছেন—এ বিষয়ে মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি।

 

স্থানীয়দের বক্তব্য, প্রায় এক দশক আগে মন্দির কমিটির কয়েকজন সদস্যের মাধ্যমে ইসকনের অনুসারীরা সেখানে কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৬ সালের দিকে তাঁরা মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নেন বলেও স্থানীয়দের দাবি।

তবে মন্দির পরিচালনা ও জমির নিয়ন্ত্রণ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো লিখিত নথি প্রকাশ করা হয়নি। স্থানীয় মন্দির কমিটি, সেবায়েত, জেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিসের রেকর্ড যাচাই না করা পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

মন্দিরের জমি দেবোত্তর সম্পত্তি হলে এর ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা আইনগতভাবে নির্দিষ্ট নিয়মের অধীন হওয়ার কথা। কোনো সংগঠন পূজা বা ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করলেই সম্পত্তির মালিকানা তাদের হাতে চলে যায় না। একইভাবে দীর্ঘদিন বসবাস করলেও কোনো পরিবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমির মালিক হয়ে যায় না। বিষয়টি নির্ধারণে খতিয়ান, দানপত্র, নামজারি, দেবোত্তর রেকর্ড ও আদালতের নথি পরীক্ষা প্রয়োজন।

 

ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে রাইটস যশোর পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধানী দল গঠন করেছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, ডাক্তার, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের সমন্বয়ে গঠিত দলটি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছে।

তিনি জানান, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অন্যত্র চলে গেছেন। শিপ্রার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্পষ্ট হবে।

 

যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি কবির হোসেন বলেন, ছাত্রীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত চলছে। বাইরে থেকে পূজারি বা ধর্মীয় কর্মী আসতেই পারেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করে দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি জানান।

তবে নিহতের পরিবারের করা মামলায় আটজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নতুন করে তদন্তের আওতায় এসেছে। মামলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা তদন্ত ও আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

 

দশমহাবিদ্যা মন্দির যশোরের প্রাচীন স্থাপনাগুলোর অন্যতম। চাঁচড়া রাজবংশ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করে বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। রাজা শুকদেব রায় ও রাজা শ্যামসুন্দর রায়ের শাসনামলে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়।

চাঁচড়া রাজবাড়ী এলাকায় দশমহাবিদ্যার পাশাপাশি শিবমন্দির, দোচালা মন্দির, গণেশ, সরস্বতী, কমলা, অন্নপূর্ণা, ভূবনেশ্বরী, ষোড়শী, মহাদেব, তারা ও ভৈরবীর মন্দির রয়েছে। সরকারি পর্যটন তথ্যেও চাঁচড়া রাজবাড়ীকে যশোরের অন্যতম দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকারকর্মীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, শিপ্রার মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার এবং মন্দিরের জমির সরকারি জরিপের দাবি জানিয়েছেন।

তাঁদের মতে, তদন্ত চলাকালে কোনো পরিবারকে উচ্ছেদ, ভয় দেখানো বা ঘরবাড়িতে হামলা করা যাবে না। একই সঙ্গে মন্দিরের ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষা, জমির রেকর্ড প্রকাশ এবং পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

ঐতিহাসিক দশমহাবিদ্যা মন্দির ঘিরে জমি ও ব্যবস্থাপনা-বিরোধের সঙ্গে এখন একটি কিশোরীর মৃত্যুর অভিযোগ যুক্ত হয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু স্থানীয় বিরোধ নয়; এটি মন্দিরের ঐতিহ্য সংরক্ষণ, দেবোত্তর সম্পত্তির আইনগত ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। তদন্তে প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

প্রতিবেদকের সম্পর্কে তথ্য

ডেস্ক রির্পোট ।। World Hindu Times

ধর্ম | সংস্কৃতি | মানবাধিকার | সংবাদ
জনপ্রিয় খবর

বাংলাদেশে এটা আমার প্রথম দুর্গাপূজা: মার্কিন রাষ্ট্রদূত

প্রায় এক দশক আগে মন্দির কমিটির কয়েকজন সদস্যের মাধ্যমে ইসকনের অনুসারীরা সেখানে কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৬ সালের দিকে তাঁরা মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নেন বলেও স্থানীয়দের দাবি।

ইসকন আসার পরই বদলে গেল মন্দিরের চিত্র? উচ্ছেদ-আতঙ্কে ৬ পরিবার!

আপডেটের সময় : ০৬:০২:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যশোর শহরের চাঁচড়া রাজবাড়ীসংলগ্ন ঐতিহাসিক দশমহাবিদ্যা মন্দিরের জমি দখল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ—ইসকনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। মন্দির এলাকায় বসবাসকারী ছয়টি পরিবারকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

এদিকে মন্দির চত্বর থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রী শিপ্রা ঘোষের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় ইসকনের আট সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা মামলা হয়েছে। নিহতের ভাই পাপন কুমার ঘোষ রোববার যশোর আদালতে মামলাটি করেন। মামলায় শিপ্রাকে মারধরের পর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

 

১৮ সেপ্টেম্বর রাতে মন্দির চত্বরের একটি জরাজীর্ণ ঘর থেকে শিপ্রা ঘোষের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। সে শহরতলীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দশম শ্রেণিতে পড়ত।

পরদিন শিপ্রার লাশ নিয়ে স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা যশোর প্রেস ক্লাবের সামনে সড়কে বিক্ষোভ করেন। তাঁদের অভিযোগ, মন্দিরের অধ্যক্ষ ও তাঁর সহযোগীদের অসদাচরণ, গালাগাল, মারধর, অপমান ও যৌন হয়রানির শিকার হয়ে শিপ্রা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে।

তবে নিহতের পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তাঁদের অভিযোগ, শিপ্রাকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

মামলার বাদী পাপন কুমার ঘোষ অভিযোগ করেন, ঘটনার দিন ইসকনের অধ্যক্ষ অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাস এবং তাঁর সহযোগীরা প্রথমে তাঁর মাকে গালাগাল করেন ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে আহত করেন। পরে শিপ্রার ওপর হামলা চালানো হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে মন্দিরের অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাস আত্মগোপনে থেকে মুঠোফোনে বলেন, মন্দিরটি দেবোত্তর সম্পত্তি। কাউকে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়নি। শিপ্রাকে কোনো কটু কথা বলা হয়নি এবং তাঁকে মারধরের প্রশ্নই ওঠে না।

 

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মন্দির এলাকার জমিতে তাঁরা ৭০ থেকে ৮০ বছর ধরে বংশপরম্পরায় বসবাস করছেন। তাঁদের দাবি, প্রায় ৬২ শতক জমিতে আগে ১০টি পরিবার বসবাস করলেও বর্তমানে সেখানে ছয়টি পরিবার রয়েছে।

বাসিন্দা মৌসুমি ঘোষ, সুরঞ্জন বিশ্বাস, শুভ ঘোষ ও মনি বিশ্বাসের অভিযোগ, ইসকনের অনুসারীরা বিভিন্ন সময়ে তাঁদের জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্য হুমকি দিয়েছেন। মন্দিরের জায়গায় আরও বড় স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা থেকেই তাঁদের উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে বলে তাঁরা দাবি করেন।

তাঁদের ভাষ্য, ইসকনের অনুসারীরা মন্দিরের জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছেন। এ কারণে দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, মন্দিরের ভেতরে কয়েকটি ছোট ঘরে বাইরের তরুণদের রাখা হয়। তাঁরা বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে সেখানে অবস্থান করেন। তাঁদের পরিচয় ও অবস্থানের বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।

তবে মন্দিরে নতুন আসা সুমন বিশ্বাস ওরফে সুমুখ শ্যামহরিদাস বলেন, আগের পূজারিরা চলে যাওয়ায় পূজা চালু রাখার জন্য তাঁদের পাঠানো হয়েছে। মন্দিরের জমিতে বসবাসকারীদের উচ্ছেদের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শান্ত রায় নামে এক যুবকের বাড়ি পঞ্চগড়ের হাড়িভাসা গ্রামে। তিনি যশোর এমএম কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। প্রায় তিন মাস ধরে তিনি মন্দির এলাকায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

শান্ত রায় দাবি করেন, তিনি সেখানে ভাড়ায় থাকেন এবং প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা ভাড়া দেন। তবে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের কোনো প্রমাণপত্র দেখাতে তিনি রাজি হননি।

মন্দির এলাকায় কারা থাকেন, তাঁদের পরিচয় কী এবং কোন দায়িত্বে তাঁরা অবস্থান করছেন—এ বিষয়ে মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি।

 

স্থানীয়দের বক্তব্য, প্রায় এক দশক আগে মন্দির কমিটির কয়েকজন সদস্যের মাধ্যমে ইসকনের অনুসারীরা সেখানে কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৬ সালের দিকে তাঁরা মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নেন বলেও স্থানীয়দের দাবি।

তবে মন্দির পরিচালনা ও জমির নিয়ন্ত্রণ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো লিখিত নথি প্রকাশ করা হয়নি। স্থানীয় মন্দির কমিটি, সেবায়েত, জেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিসের রেকর্ড যাচাই না করা পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

মন্দিরের জমি দেবোত্তর সম্পত্তি হলে এর ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা আইনগতভাবে নির্দিষ্ট নিয়মের অধীন হওয়ার কথা। কোনো সংগঠন পূজা বা ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করলেই সম্পত্তির মালিকানা তাদের হাতে চলে যায় না। একইভাবে দীর্ঘদিন বসবাস করলেও কোনো পরিবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমির মালিক হয়ে যায় না। বিষয়টি নির্ধারণে খতিয়ান, দানপত্র, নামজারি, দেবোত্তর রেকর্ড ও আদালতের নথি পরীক্ষা প্রয়োজন।

 

ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে রাইটস যশোর পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধানী দল গঠন করেছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, ডাক্তার, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের সমন্বয়ে গঠিত দলটি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছে।

তিনি জানান, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অন্যত্র চলে গেছেন। শিপ্রার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্পষ্ট হবে।

 

যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি কবির হোসেন বলেন, ছাত্রীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত চলছে। বাইরে থেকে পূজারি বা ধর্মীয় কর্মী আসতেই পারেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করে দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি জানান।

তবে নিহতের পরিবারের করা মামলায় আটজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নতুন করে তদন্তের আওতায় এসেছে। মামলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা তদন্ত ও আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

 

দশমহাবিদ্যা মন্দির যশোরের প্রাচীন স্থাপনাগুলোর অন্যতম। চাঁচড়া রাজবংশ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করে বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। রাজা শুকদেব রায় ও রাজা শ্যামসুন্দর রায়ের শাসনামলে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়।

চাঁচড়া রাজবাড়ী এলাকায় দশমহাবিদ্যার পাশাপাশি শিবমন্দির, দোচালা মন্দির, গণেশ, সরস্বতী, কমলা, অন্নপূর্ণা, ভূবনেশ্বরী, ষোড়শী, মহাদেব, তারা ও ভৈরবীর মন্দির রয়েছে। সরকারি পর্যটন তথ্যেও চাঁচড়া রাজবাড়ীকে যশোরের অন্যতম দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকারকর্মীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, শিপ্রার মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার এবং মন্দিরের জমির সরকারি জরিপের দাবি জানিয়েছেন।

তাঁদের মতে, তদন্ত চলাকালে কোনো পরিবারকে উচ্ছেদ, ভয় দেখানো বা ঘরবাড়িতে হামলা করা যাবে না। একই সঙ্গে মন্দিরের ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষা, জমির রেকর্ড প্রকাশ এবং পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

ঐতিহাসিক দশমহাবিদ্যা মন্দির ঘিরে জমি ও ব্যবস্থাপনা-বিরোধের সঙ্গে এখন একটি কিশোরীর মৃত্যুর অভিযোগ যুক্ত হয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু স্থানীয় বিরোধ নয়; এটি মন্দিরের ঐতিহ্য সংরক্ষণ, দেবোত্তর সম্পত্তির আইনগত ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। তদন্তে প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।